ব্রিটেনে নিজের বাগানে ধান চাষ করে নতুন ইতিহাস গড়ছেন আজম খান
প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ৩:০৪:৪৬

ব্রিটেনে নিজের বাড়ির বাগানে আজম খান
লন্ডন, ৩১ আগস্ট : বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষি সংস্কৃতির সঙ্গে ব্রিটেনের মাটির এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শেফ, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আজম খান। ব্রিটেনে নিজের বাড়ির বাগানে সফলভাবে ধান চাষ করে তিনি শুরু করেছেন এক ব্যতিক্রমী ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।
২০২৪ সালে ধান চাষের এই প্রকল্প শুরু করেন আজম খান। ব্রিটেনের তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ায় বাংলাদেশের মতো উষ্ণপ্রধান দেশের ঐতিহ্যবাহী ফসল ধান উৎপাদনের এই প্রচেষ্টা ইতোমধ্যে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
খাদ্য ও কৃষির প্রতি আজম খানের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা এবং বাংলাদেশের কৃষি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কই তাঁকে এই উদ্যোগে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি তাঁর বাগানে সর্বশেষ ধানের ফসল সংগ্রহ করা হয় উৎসবমুখর পরিবেশে। এ সময় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। ধান কাটার এই আয়োজন শুধু একটি কৃষি প্রকল্পের সাফল্য উদযাপন নয়, বরং বাংলাদেশের শিকড় ও ঐতিহ্যকে ব্রিটেনের মাটিতে নতুনভাবে তুলে ধরার একটি প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশি কারি শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ
আজম খান ব্রিটেনে বাংলাদেশি কারি শিল্পের বিকাশ ও প্রসারে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। ১৯৬২ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৮০ সালে যুক্তরাজ্যে আসার পর পূর্ব লন্ডনকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন।
কয়েক দশকের কর্মজীবনে তিনি ব্রিটেনের বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। খাদ্যশিল্পে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেছেন একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা।
এর মধ্যে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কারি শেফ অব দ্য ইয়ার, ন্যাশনাল কারি শেফ অব দ্য ইয়ার, টেসকো স্পিনাচ মাস্টার শেফ, সাউথওয়ার্ক কারি শেফ অব দ্য ইয়ার এবং ১৯৯৯ সালের টাওয়ার হ্যামলেটস কারি শেফ অব দ্য ইয়ার পুরস্কার।
রেস্টুরেন্ট ব্যবসাতেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। লন্ডনের সুপরিচিত বেঙ্গল ক্লিপার্স ও বেঙ্গল ট্রেডার্স-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খাবারের সঙ্গে আধুনিক উপস্থাপনা ও সমকালীনতার সমন্বয় ঘটিয়ে রেস্টুরেন্টগুলোর সুনাম প্রতিষ্ঠায় তিনি ভূমিকা রাখেন।

শিক্ষা ও সমাজসেবায়ও সক্রিয়
খাদ্য ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি শিক্ষা, কমিউনিটি উন্নয়ন এবং দাতব্য কর্মকাণ্ডেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় আজম খান।
তিনি ব্রিটিশ বাংলা এডুকেশন ট্রাস্ট-এর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া সিলেট একাডেমি-র সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা বিস্তারে নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন আজম খান এডুকেশন ট্রাস্ট। তিনি শাহজালাল কলেজ ইনস্টিটিউট-এরও একজন সদস্য।
বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধন আরও দৃঢ় করা, শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং কমিউনিটির উন্নয়নে তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে প্রশংসিত হয়ে আসছে।

ব্রিটেনে ধান চাষ—এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ধানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। সেই ধানই এবার ব্রিটেনের মাটিতে চাষ করে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন আজম খান।
ব্রিটেনে বাগান ও অ্যালটমেন্টে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফসল চাষের প্রচলন থাকলেও ধান সাধারণত এখানকার প্রচলিত ফসল নয়। ফলে নিজের বাগানে সফলভাবে ধান উৎপাদনের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
২০২৪ সালে শুরু করা প্রকল্পটির মাধ্যমে আজম খান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখিয়েছেন, সঠিক পরিচর্যা, নিষ্ঠা ও কৃষি কৌশল প্রয়োগ করলে ভিন্ন পরিবেশেও ঐতিহ্যবাহী ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সর্বশেষ ধানের ফসল ঘরে তোলার সময় উপস্থিত কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকরা এই অভিনব উদ্যোগের সাফল্য প্রত্যক্ষ করেন।

‘শুধু ধান চাষ নয়, নতুন ইতিহাস’
আজম খানের এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু নিজের বাগানে ধান উৎপাদন করা নয়। তিনি মনে করেন, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে ব্রিটেনে ধান চাষের সম্ভাবনা নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ খুলে দিতে পারে।
তাঁর এই প্রকল্প খাদ্য, কৃষি, সংস্কৃতি ও কমিউনিটির সঙ্গে তাঁর আজীবনের সম্পর্কেরই একটি নতুন অধ্যায়। তাঁর প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ অন্যদেরও ভিন্ন পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী ফসল চাষে উৎসাহিত করবে।
তাঁর ভাষায়, এটি শুধু ধান চাষের বিষয় নয়—এর মাধ্যমে তিনি “নতুন ইতিহাস তৈরি” করতে চান।
বাংলাদেশি ক্যাটারিং শিল্পে পথিকৃৎ হিসেবে তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ার, শিক্ষা ও দাতব্য কর্মকাণ্ড এবং এবার ব্রিটেনে ধান চাষের এই অভিনব উদ্যোগ—সব মিলিয়ে আজম খানের পথচলা যেন খাদ্য, সংস্কৃতি, কৃষি, শিক্ষা ও কমিউনিটির প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
ব্রিটেনের একটি বাড়ির বাগানে এই ধান চাষ হলেও এর শিকড় রয়েছে হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের মাটি, কৃষি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীরে। আর সেই ঐতিহ্যকেই ব্রিটেনের মাটিতে নতুনভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন আজম খান।



