৪ জন খালাস
এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে দলবদ্ধ ধর্ষণকাণ্ডে ১ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ জুলাই ২০২৬, ৮:৩১:২২

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাইফুর রহমানকে আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ
লবীব আহমদ : সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক গৃহবধূকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বহুল আলোচিত মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। এ মামলার ৮ আসামির মধ্যে একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি চারজনকে অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় ঘোষণা করেন। আদালত দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে রায় পাঠ শুরু করেন এবং বেলা ১টা ৫৩ মিনিটে রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ও খালাসপ্রাপ্ত সবাই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত। এর আগে অভিযুক্ত সব আসামিকে কারাগার থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে আদালতে আনা হয়। রায় ঘোষণার সময় সব আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন। তিনি বলেন, মামলার রায়ে আদালত সাইফুরকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাথে আরও ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন।মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা সাপেক্ষে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে গলায় ফাঁশি দ্বারা ঝুলিয়ে রাখতে হবে। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় আর কোনো দণ্ড দেওয়া হয়নি। সে চাইলে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে আপীল করতে পারবে। আর তারেক, অর্জুন ও রনিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসাথে তাদেরকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। তাদের অপর একটি ধারায় ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই জরিমানার টাকা ভিকটিমের পরিবারের সদস্যরা প্রাপ্ত হবেন।আসামীদের উভয় ধারায় আরোপিত দণ্ড একই সাথে চলবে এবং ইতিমধ্যে হাজতবাসকালীন সময় সাজা ভোগ করেছে গন্যে আরোপিত দণ্ড হতে বাদ যাবে। বাকি ৪ জনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদেরকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়। অন্য কোন মামলায় আটকাদেশ না থাকলে তাদের এখনই অবমুক্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, এই মামলাটি তৎকালীন সরকার দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রেখেছিল। তখন ভালোভাবে তদন্ত, উপযুক্ত প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হয়নি। নাহলে সবারই সাজা হতো। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পরে এটির যে এখন বিচার হয়েছে, সেজন্য রাষ্ট্রপক্ষ সহ সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।
তবে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসামি পক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী বলেন, এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য দেয়নি। ভিকটিমও আসামিদের শনাক্ত করেনি। অপরাধ প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবো।
এর আগে সকালে আসামিরা সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আমরা ধর্ষণকারী না ভাই, আমরা ধর্ষণ করিনি। রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে আমাদের মামলার আসামি করা হয়েছে। ভিকটিমও আমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনেনি।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী হল- সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার ছেলে সাইফুর রহমান (২৮)। আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামীরা হলেন- হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বাগুনীপাড়ার শাহ জাহাঙ্গির মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), জকিগঞ্জের আটগ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর ওরফে কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৬)।
খালাসপ্রাপ্তরা হলেন- দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুরের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫), কানাইঘাট উপজেলার লামা দলইকান্দির (গাছবাড়ী) সালিক আহমদের ছেলে মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), সিলেট নগরীর গোলাপবাগ আবাসিক এলাকার মৃত সোনা মিয়ার ছেলে আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল (২৬) ও বিয়ানীবাজার উপজেলার নটেশ্বর গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের ছেলে মিজবাউল ইসলাম রাজনকে (২৭)।
এর আগে গত বুধবার মামলার আসামি পক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ সর্বশেষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এদিনই শেষবারের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত মঙ্গলবার চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন।
তার আগে, সিলেটের নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল থেকে গত বছরের মে মাসে সিলেটের দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটো স্থানান্তর হয়ে আসলে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূ ও তার স্বামী (মামলার বাদী), মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, আসামিদের স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেট, ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারসহ সর্বমোট ২৫ জন সাক্ষী আদালতে তাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন।
জানা গেছে, প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য কালো থাবার মুখে আটকে যায় বিচার কার্যক্রম। এখানেই শেষ নয় ক্ষমতার দাপট এতোটাই ছিল যে, ওই সময়ে কোনো আসামিকে আদালতে পর্যন্ত আনা হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে প্রায় এক বছর মামলা দুটোর বিচার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকার পরে অবশেষে গতি ফিরে আসে।
কি ঘটেছিল সেদিন?
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জৈনপুরের ২৪ বছর বয়সী এক যুবক তার ১৯ বছর বয়সী নববিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে প্রাইভেটকারযোগে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান। প্রাইভেটকারসহ গৃহবধূ ও তার স্বামীকে জোরপূর্বক জিম্মি করে কলেজের ছাত্রাবাসের অভ্যন্তরে নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে ছাত্রাবাসের ৭ নং ব্লকের ৫ম তলা বিল্ডিং এর সামনে প্রাইভেটকারের মধ্যেই গৃহবধূকে জোরপূর্বক গণধর্ষণ করে। ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি ধর্ষকরা, গৃহবধূর সাথে থাকা টাকা, স্বর্ণের চেইন ও কানের দুল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আটকে রাখে তাদের প্রাইভেট কারও। এঘটনায় নির্যাতিতার স্বামী বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ৩-৪ জনকে আসামী করে শাহপরান (র.) থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। দেশের অন্যতম পুরনো বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রেক্ষিতে সরকার ধর্ষণের সাজার আইনের পরিবর্তন করে মৃত্যুদন্ডের ঘোষণা দেয়। ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান করে জাতীয় সংসদে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল ২০২০ পাশ হয়।
একই সময়ে পুলিশ ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ২৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র ও চাঁদাবাজি আইনে আরেকটি মামলা করে। দুটো মামলারই রায় একই দিনে হয়। একই ঘটনায় দুটো মামলা হওয়ায় আদালত এটিকে এক রায়ে নিয়ে আসেন।
গণধর্ষণের পর আইনশৃংখলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ধর্ষকদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত আট ধর্ষকের সকলেই ছাত্রলীগের টিলাগড় গ্রুপের গডফাদার ও জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রনজিত সরকারের অনুসারী। গ্রেফতারের পর ৮ আসামির সকলেই অকপটে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেয়।
গ্রেফতারের পর আদালত তাদের প্রত্যেককে ৫ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে ৮ আসামীর সকলেই জবানবন্দিতে গৃহবধূকে তুলে নেয়াসহ গণধর্ষণ ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয়জনের সঙ্গে ধর্ষণের ঘটনার আলামতের মিল পাওয়া যায়।



