প্রবাসীকে পিটিয়ে পানিতে ফেলে হত্যা, নারীসহ গ্রেফতার ৯
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ জুন ২০২৬, ২:১২:৪৬

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে মালয়েশিয়া প্রবাসী যুবক আমান উল্লাহ ওরফে আমিনকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় হাউসবোটের মালিক ও তার স্ত্রীসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বুধবার সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থানায় ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন নিহতের পিতা কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের খলাপাড়া গ্রামের কামাল মিয়া ওরফে কামাল মাঝি।
ওই মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামিরা হলেন- টাঙ্গুয়ার হাওড়কেন্দ্রিক পর্যটক পরিবাহী হাউসবোটের মালিক কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার পাঁচরা গ্রামের ফরিদ উল্লাহর ছেলে ফায়াদ বায়েজিদ, তার স্ত্রী শারমিন খান হীরা, বোটের স্টাফ মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার বামৈল পশ্চিমপাড়ার সামছুল আলমের ছেলে হোসাইন শাহ, একই জেলার একই উপজেলার সেলামতি গ্রামের হাসান আলীর ছেলে উসামা বিন হাসান, বান্দরবন জেলার আলীকদম উপজেলার রতীচন্দ্র পাড়ার হামাজান ত্রিপুরার ছেলে জয় ত্রিপুরা, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামের আলমাস নুরের ছেলে হাবিব মিয়া, বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার ডানডোবা গ্রামের আব্দুর রহমান ভুঁইয়ার ছেলে রাজীব ভুঁইয়া, সুনামগঞ্জ জেলা শহরের তেঘরিয়ার আরজত আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, খুলনার রূপসা উপজেলার সিংগেরচর গ্রামের নুর মোহাম্মদের ছেলে মনিরুল খান।
একই মামলায় গ্রেফতারকৃতরা ছাড়াও বোটের স্টাফ সুনামগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিম তেঘরিয়ার তাজিরুল ইসলামের ছেলে আজাদুল হক, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ধরুন্দ গ্রামের জামাল মিয়ার ছেলে দুলাল মিয়াকে পলাতক আসামি দেখিয়ে ৩ থেকে ৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
বুধবার বিকালে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম জাকির হোসেন যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, গ্রেফতারকৃত ৯ জনকে বুধবার আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালতের বিচারক আসামিদের জেলা কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার বাদী নিহতের পিতা কিশোরগঞ্জের ভৈরবের খলাপাড়া গ্রামের কামাল মিয়া ওরফে কামাল মাঝি জানান, সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বাদাঘাট, বালিজুরী, আনোয়াপুরসহ বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীদের চাহিদা পূরণে ভৈরব বাজার থেকে খাদ্যসামগ্রী, ভোজ্যতেল, নির্মাণ সামগ্রীবোঝাই বড় ট্রলারে করে নিয়ে আসে। সোমবার আনলোড করে ফের ভৈরবে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাদাম, ধানের কুড়া, খালি ড্রাম বোঝাই করা হয়। সোমবার রাতে তাহিরপুরের আনোয়ারপুরের পাতারি গ্রামের রক্তি নদীর ঘাটে ঝড়বৃষ্টির কারণে নোঙর করে রাখা হয় ট্রলারটি।
ওই ঝড়বৃষ্টির সময় ট্রলারের ভেতর মাঝি, সুকানি মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলে আমান উল্লাহ ওরফে আমিনসহ ট্রলারে থাকা পাঁচজন রাত ২টার দিকে খাবার খেতে বসেন। এ সময় পাশে থাকা টাঙ্গুয়ার হাওড়কেন্দ্রিক পর্যটক পরিবাহী হাউসবোট ‘নটিলাসকে’ পাহাড়ি স্রোতের তোড়ে ধাক্কা দেয় ট্রলারটি। এরপর ট্রলার ও হাউসবোটের লোকজনের মধ্যে এ নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি হয়।
একপর্যায়ে হাউসবোটের মালিকসহ বোটে থাকা স্টাফরা সংঘবদ্ধ হয়ে ট্রলারের ভেতর থাকা পাঁচজনকে বেধড়কভাবে লাঠিপেটা শুরু করেন। ট্রলারের ভেতর থাকা আমান উল্লাহ আমিনসহ চারজনকে রক্তি নদীর পাহাড়ি ঢলের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ট্রলার মালিক কামাল মিয়া ওরফে কামাল মাঝিকে ট্রলার থেকে তুলে নেওয়া হয় হাউসবোটে। এদিকে অন্যরা সাঁতরে তীরে উঠলেও কামাল মাঝির ছেলে আমান উল্লাহ ওরফে আমিন রক্তির নদীর পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে নিখোঁজ হন।
এদিকে ট্রলার মালিক কামাল মাঝিকে হাউসবোটে নিয়ে হাত-পা বেঁধে বেধড়কভাবে লাঠিপেটা করা হয়; আটকে রাখা হয় প্রায় ঘণ্টা তিনেক। একপর্যায়ে হাউসবোটে ডাকাতি করতে এসেছিল ট্রলারের পাঁচজন- এমন স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও বক্তব্য ধারণ করে ওই ট্রলার মালিক কামালকে মঙ্গলবার ভোররাতে ছেড়ে দেয় হাউসবোটের মালিক, তার স্ত্রী ও স্টাফরা।
সোমবার রাতে লাঠিপেটার শিকার ট্রলারের একজনকে মঙ্গলবার সকালে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে নিজের প্রবাসী ছেলে আমান উল্লাহ আমিনের সন্ধান না পেয়ে বিষয়টি তাহিরপুর থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়।
এরপর সুনামগঞ্জ থেকে আসা ফায়ার সার্ভিসের একটি ডুবুরি দল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে রক্তি নদীর গভীর পানির তলদেশ থেকে আমান উল্লাহ ওরফে আমিনের লাশ উদ্ধার করেন।
বুধবার সকালে নিহতের লাশ জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরের দিকে নিহতের লাশ দাফনের জন্য ভৈরবের খলাপাড়া নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তাহিরপুর থানার এসআই দীপক চন্দ্র দাস জানান, অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্তকরণ, পলাতক দুই আসামিকে গ্রেফতারে পুলিশি অভিযান চলমান রয়েছে। এছাড়া ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূল্যের পর্যটক পরিবাহী হাউসবোট ‘নটিলাস’ জব্দ করা হয়েছে।



