জীবনের পথে, মানুষের তরে ডা. এস এম আসাদুজ্জামান জুয়েল
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ জুলাই ২০২৫, ১১:২২:২৬
* আহমাদ সেলিম *
মন খুলে মানুষ চিকিৎসকের সাথে কথা বলতে চায়। কিন্তু সব চিকিৎসকের সামনে মানুষ কথা বলতে সাহস পায়না। এই না পারার জন্যেই হয়তো কেউ কেউ ডাক্তার বদল করেন, দেশ বদল করেন। আবার কোনো কোনো চিকিৎসকের সাথে দেখা করলে, অনেক রোগী সুস্থ্য বোধ করেন, মনে সাহস নিয়ে চেম্বার থেকে বাড়ি ফিরেন।
চিকিৎসকের মুখের কথাও এক ধরণের ওষুধ, রোগীর প্রশান্তি। অনেক রোগী চিকিৎসকের ডিগ্রি দেখেন না, সুন্দর ব্যবহার দেখেন। সেই ব্যবহারের প্রশংসা ছড়িয়ে দেন সবখানে।
ডাক্তার এস এম আসাদুজ্জামান জুয়েল কি সেরকম কেউ? নইলে রোগী কেন বলবে, ‘এই স্যারের সাথে মন খুলে কথা বলা যায়।’
একজন চিকিৎসকের চিকিৎসাবিদ্যা ছাড়াও আরো অনেক যোগ্যতার পরীক্ষা হয় উন্নত দেশগুলোতে। চিকিৎসকের ব্যবহার কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে রোগীর কাছে, চিকিৎসকের প্রতি রোগীর আস্থা কতটা তৈরী হয়েছে-এরকম নানা বিষষকে গুরুত্ব দেয়া হয়। তারপর থাকে স্বীকৃতি কিংবা নিয়োগের বিষয়।
ডাক্তার জুয়েল রোগীর সাথে যখন কথা বলেন, তখন মনে হয় দুজন পরিচিত, ঘনিষ্ট কেউ। খুব সহজে মানুষকে আপন ভাবার, কাছে টেনে নেয়ার একটা গুণ সবার চোখে পড়ে। এজন্যই হয়তো মানুষ তাঁর কাছে ছুটে যান। প্রায় সময় শুনি, তিনি বাকিতে অপারেশনও করেন। অপারেশনের পর রোগী কয়েক কিস্তিতে (ধাপে) সেই টাকা পরিশোধ করেন।
গরিব রোগীদের বেলায় তিনি অন্যজুয়েল। টাকা তো কম রাখেনই, অনেক সময় দূরের রোগীদের যাথায়াত খরচটাও মাথায় রাখেন। প্রয়োজনের বাইরে একাধিক টেস্ট করানোর পক্ষেও নন তিনি। এ রকম অনেকগুলো গুণের কারণেই হয়তো মানুষ তাঁর ‘দোস্ত’ হয়ে যায় সহজে।
ডাক্তার এস এম আসাদুজ্জামান জুয়েল সবসময় বলেন, ‘আমাকে আল্লাহ ডাক্তার বানিয়েছেন মানুষের কল্যাণের জন্য, শুধু টাকা কামানোর জন্যে নয়। দিনশেষে একটা জায়গায় প্রতিটি মানুষকে জবাবদিহি করতে হয়।’ চিকিৎসকরা মানুষের যত বেশি সেবার সুযোগ পান, অন্য পেশাজীবীরা ততটা পান না। কাজেই একজন চিকিৎসকের অনেকগুলো বাড়তি গুণ প্রকৃতি থেকেও দেয়া হয়।
মনে রাখা দরকার, রোগীর প্রতি চিকিৎসকের যে দায়িত্ব রয়েছে, এর অন্যতম হচ্ছে, রোগীকে সম্মান করা। সম্মানের অর্থ রোগীর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনা। তার রোগ বা তাকে নিয়ে বিদ্রƒপাত্মক কোনো কথা না বলা। অনেক চিকিৎসক গরিব রোগীর চেয়ে ধনী রোগীকে বেশী প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, যা আদৌ কাম্য নয়। আবার চিকিৎসকের উপর যাতে বেশী চাপ সৃস্টি করা না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল বর্তমানে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিউরোসার্জারী বিভাগের সহকারি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজের ২৫তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন ১৯৮৬-৮৭ সালে।
২০০৩ সালে ২১তম ব্যাচে বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে যোগদান করেন। প্রথম চাকরী হয় ১৯৯৪ সালে, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে। এটি ঢাকার বেসরকারি একটি কলেজ।
১৯৯৬ সালের শেষের দিকে চলে এলেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান প্রতিষ্টান রাগীব-রাবেয়া হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হয়ে। সেখানে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কখনো আউটডোর, ইনডোর এমনকি লেকচারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একইসাথে রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল সেন্টারেও চার বছর ছিলেন পরিচালক হিসেবে। সেই মেডিক্যাল সেন্টার ছিলো কামালবাজারের রাগীবনগরে। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঢাকাস্থ বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে ২০০৩ সালে নিউরো সার্জারী বিভাগে এম.এস ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি হন।
২০০৩ সালে ২৮ মে সরকারি চাকরীতে যোগদান করেন। সরকারি চাকরীর প্রথম কর্মস্থল হয় সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলায়। সেখানে ছিলেন প্রায় তিন বছর। পরে আবার চলে আসেন স্মৃতির ক্যানভাসে, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে এই হাসপাতালে যাত্রা শুরু হয়।
২০০৭ সাল পর্যন্ত হাসপাতালে পোস্ট গ্রেজুয়েশন ট্রেনিং শেষে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য আবার বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ে ফিরে যান। ২০১৬ সাল পর্যন্ত ওখানে ছিলেন। ২০১৪ সালের দিকে সিলেটে একটি সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন সদা হাস্যোজ্জ্বল এই চিকিৎসক। সেই দুর্ঘটনায় এক পা ভেঙ্গে যায়। দুর্ঘটনায় আড়াইবছর শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। বিছানায় শয্যাশায়ী থাকা অবস্থায়ও সেবার কাজ থেমে থাকেনি। মহামারি করোনার মতো কঠিন সময়েও তিনি মানুষের পাশে ছিলেন।
দুর্ঘটনার পর ওসমানী হাসপাতালে নিউরো সার্জারীর আর এস (প্রথম আবাসিক সার্জন) হিসেবে যোগদান করেন। এই পদ প্রথম শুরু হয় হাসপাতালে, ২০১৬ সালে। ২০২০ সালে, চলতি দায়িত্বে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিউরো সার্জারী বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তারপর দীর্ঘ আট বছর পর ২০২৩ সালে হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে স্থায়ী হন এই চিকিৎসক।
ডা. এস এম আসাদুজ্জামান জুয়েল স্ত্রী এবং একমাত্র সন্তান নিয়ে সিলেটের রিকাবীবাজারস্থ পুরাতন মেডিকেলের সরকারী কোয়ার্টারে বসবাস করছেন। স্ত্রী মিসেস গুলনাহার বেগম পরিবার কল্যাণ রিজিওন্যাল পপুলেশন ট্রেনিং ইউস্টিটিউটে (আরপিটিআিই) প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর ছেলে রাইয়ান বিভোর সুলগ্ন এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেছেন সিলেটের স্কলার্স হোম স্কুল এন্ড কলেজ থেকে।
চিকিৎসাবিদ্যার ছোটাছুটির মধ্যেই জীবনের গল্প আবদ্ধ নয় ডা. জুয়েলের। মানুষের সেবার পাশাপাশি তাঁর সখের আরেক ভূবন লেখালেখি। দির্ঘদিন সাংবাদিকতা করছেন দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায়। এখনো কাজের ফাঁকে, অবসরে সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সাংবাদিকদের সেবা দেয়ার মানসে একান্ত নিজ উদ্যোগে সেই সিলেটের ডাক অফিসের বার্তা কক্ষে খুলেছেন স্বাস্থ্যসেবামূলক একটি ‘হেলথ কর্ণার’।
একদিন যে মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র হয়ে প্রবেশ করেছিলেন, সেই মেডিক্যালের চিকিৎসক হয়ে সিলেটবাসীর সেবা দিতে এখনো সক্রিয় ডা. এস এম আসাদুজ্জামান জুয়েল। সেবায় ব্রত মানুষটির দির্ঘজীবন কামনা করছি। তিনি মানুষকে যেভাবে মূল্যায়ন করে যাচ্ছেন, রাষ্ট্র তাঁর প্রতিও সম্মান দেখাবে-সেই প্রতাশা আমাদের।