আবদুল হামিদের ‘ইচ্ছাপূরণ’ উড়ালসড়ক প্রকল্প বাতিল
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ জুন ২০২৫, ৯:০৯:৫৪
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিচ্ছে সেতু কর্তৃপক্ষ ।। হাওর-জলাভূমির ওপর বিরূপ প্রভাবের শঙ্কা ।। ভূমি অধিগ্রহণে পরিশোধিত টাকা ফেরতের নির্দেশ ।। ঠিকাদার-পরামর্শক নিয়োগ বাতিল ৩০ জুনের মধ্যে
১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়ালসড়ক নির্মাণের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাতিল করেছে সরকার
কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলা সদর থেকে করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালী পর্যন্ত উড়ালসড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাতিল করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। হাওরাঞ্চলে জলাভূমির ওপর বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা এবং সরকারের খরচ কমানোর অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ইচ্ছায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৫ হাজার ৬৫১ কোটি ১৩ লাখ টাকার এ প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছিল। তবে জলাভূমি ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব, উচ্চ ব্যয় এবং অপ্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি একনেকসভায় উড়ালসড়ক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। হাওর এলাকায় এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুুল হামিদের ইচ্ছায় মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নির্মাণও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে বলে পরিবেশবাদীরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। মোট ৪৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ওই সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল হাওরের ওপর বাঁধ দিয়ে। হাওরের পানি পারাপারের জন্য কিছু চ্যানেল খোলা রাখা হলেও সড়কটি ২০২০ সালে চালুর পর তীব্র বন্যা সৃষ্টি হয়। বলা হয়েছিল- উড়ালসড়কের নির্মাণ খরচ উঠবে টোলে। তবে সমীক্ষায় সম্ভাব্য টোল ধরা হয়েছে যমুনা সেতুর চেয়েও বেশি।
সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাস্তবতার নিরিখে কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলা সদর থেকে করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালী পর্যন্ত উড়ালসড়কের কাজ অসমাপ্ত রেখে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ উড়ালসড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম বাতিল করে ইতোমধ্যে পরিশোধিত ১৫০ কোটি টাকা ফেরত আনতে হবে এবং ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কার্যক্রম ৩০ জুনের মধ্যে বাতিল করতে হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের সাইট অফিস ভাড়া ৩১ আগস্টের মধ্যে বাতিল এবং গাড়ি
সরবরাহ চুক্তি বাতিলের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একজন উপপ্রকল্প পরিচালক, একজন সহকারী প্রকৌশলী এবং একজন উপসহকারী প্রকৌশলীর বেতনভাতাদি মনিহারি সামগ্রী ও অন্যান্য ব্যয়সহ অনুমোদিত কাজ অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত করতে প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধরে আরডিপিপি প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিয়েছেন সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি বরাদ্দ ৯৭০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ছিল। এর মধ্যে জিওবি ঋণ ৩৩৯০.৬৮ কোটি টাকা এবং অনুদান ২২৬০.৪৫ কোটি টাকা অনুমোদিত ছিল। প্রকল্পের নির্মাণকাজের ঠিকাদার নিয়োগে গত বছরের ১২ মার্চ দরপত্র আহ্বান করা হয়। চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভায় দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করে দর দাখিলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জামানত ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একইভাবে প্রকল্পের ডিজাইন ও নির্মাণকাজ তদারকিতে পরামর্শক নিয়োগের ৫টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দাখিল করেছিল। এখন পরামর্শক নিয়োগের কার্যক্রম বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে ৩২৮ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার ৩১ টাকার প্রাক্কলন ছিল। প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত আসায় এখন ১৫০ কোটি টাকা ফেরত আনার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত ১৬ জনের নিয়োগ বাতিল ও বরাদ্দকৃত গাড়ি সরবরাহের চুক্তি বাতিল হচ্ছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, উড়ালসড়ক নির্মাণে চাপ ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতির। এ কারণেই প্রকল্পটিকে লাভজনক দেখানো হয় সমীক্ষায়। সমীক্ষা চলাকালে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া চিঠির সবগুলোতে বলা হয়েছে- ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতির সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটিকে লাভজনক দেখাতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়া হয়েছিল। ২০২৭ সালে দৈনিক ১৬ হাজার ৬৬৬ এবং ২০৩০ সালে ২৫ হাজার ৭০৮টি যানবাহন চলবে অনুমান করে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে হাওরে সড়ক নির্মাণের সমীক্ষায়ও বলা হয়েছিল, ২৬ হাজার যানবাহন চলবে। উদ্বোধনের পর প্রত্যাশিত যানবাহন চলাচল অনেক কম ছিল। লাভ দূরে থাক, হাওরের বুকচিরে নির্মিত সড়কটি বন্যা এবং পরিবেশগত সংকট সৃষ্টির কারণ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।